জননী জন্মভূমি

জননী জন্মভূমি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তুরস্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, এক দেশপ্রেমিক অটোম্যান সেনা অফিসারের জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে এই নাটক। এখানে মূল চরিত্রের নাম "জেভদেত"। যে একজন বিচক্ষণ ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা। গল্পের শুরুতে দেখা যায় জেভদেত তুর্কি বাহিনীর মেজর হিসেবে সেলানিকে (একটি বন্দর নগরী) দায়িত্বরত এবং এক খণ্ড যুদ্ধে জয়ী হয়ে সেনাদপ্তরে ফিরে আসে। বাড়ীতে যার অপেক্ষায় থাকে তার ভালোবাসার মানুষ স্ত্রী আজিজে, দুই কন্যা , এক ছেলে ও বৃদ্ধা মা। পরিবারের সাথে কাটে তার আনন্দঘন মুহূর্ত। কিন্তু এরপরই দেখা যায় জেভদেত তার কমান্ডিং অফিসার কর্নেল নাজিমের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে কারাগারে বন্দী। কারাগারে জেভদেতকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে এশরেফ পাশা নামে এক সাবেক তুর্কি সেনা কর্মকর্তা। কর্নেল নাজিম অর্থ আর ধন-রত্নের বিনিময়ে শহরটা গ্রিকদের কাছে হস্তান্তর করছে তা জানতে পেরে, জেভদেত সেখানে ছুটে যায়। কিন্তু সবচেয়ে কাছের বন্ধু তুর্কি অফিসার মেজর তেভফিকের বিশ্বাঘাতকতায় সে গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর আহত অবস্থায় জেভদেতকে গ্রিক বন্দীশিবিরে নিয়ে আসা হয়। জ্ঞান ফেরার পর জেভদেত জানতে পারে তার পরিবারের সবাই সেলানিকে নিহত হয়েছে। বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে জেভদেত যখন জীবিত লাশ, ঠিক তখনই একদিন জেভদেতের কাছে এশরেফ পাশার বার্তা নিয়ে আসে সার্জেন্ট ইলিয়াস নামের আরেক বন্দী। সে জেভদেতকে জানায় তার পরিবারের সবাই বেঁচে আছে। এশরেফ পাশার পক্ষ থেকে জেভদেতকে প্রস্তাব পাঠানো হয়, দেশকে বাঁচানোর জন্য তাকে দেশদ্রোহী হয়ে গ্রিক বাহিনীতে যোগ দিতে হবে। জেভদেত তাতে সম্মত হয়। সেলানিকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৭ বছর পর জেভদেত ইজমির শহরে আসে। ঘটনাক্রমে তার পরিবার আগে থেকেই ইজমিরে ছিলো। আর সেই প্রতারক বন্ধু তেভফিক তখন ইজমিরে তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। জেভদেতের এভাবে ফিরে আসাটাকে তার প্রতারক বন্ধু কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি, কারণ অনেক আগে থেকেই তেভফিকের মনে জেভদেতের স্ত্রী আজিযেকে নিজের করে পাওয়ার এক সুপ্ত বাসনা ছিলো। জেভদেত ফিরে আসায় তা অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এদিকে পরিবারের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা থাকলেও দেশকে বাঁচাতে জেভদেতকে কৌশলী হতে হয় এবং সে পরিবারের সাথে দূরত্ব তৈরী করে। সেই সুযোগে প্রতারক বন্ধুটি তার স্ত্রী'র আস্থা অর্জন করে এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। জেভদেতের পারিবারিক জীবনে নেমে আসে প্রবল সংকট। একদিকে সে স্ত্রী'র ভালোবাসা হারায়, অন্যদিকে ছোট মেয়ে জড়িয়ে পড়ে স্বদেশী আন্দোলনের সাথে, আর বড় মেয়ের উচ্চাভিলাস ডেকে আনে নতুন নতুন সংকট। সেই সাথেযোগ হয় পালক ছেলে'র প্রকাশ্য বিদ্রোহ। কিন্তু গ্রিকবাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্বে থাকায়, নিজ পরিবার আর তুর্কী সমাজের সাথে জেভদেতের দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে। তবে আড়াল থেকে সমস্ত সংকট মোকাবেলায়, জেভদেত তার পরিবার ও জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। যা কাহিনীর শুরুতে তাদের কেউই বুঝতে পারে না। এদিকে দেখা যায় নিজের কর্মদক্ষতা আর এশরেফ পাশার সুযোগ্য পরামর্শে জেভদেত পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার থেকে জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পায়।

অন্যদিকে চলতে থাকে মুস্তফা কামাল পাশার তুর্কি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ইজমির থেকে নিভৃতে সেই আন্দোলনে সব সমর্থন যুগিয়ে যায় জেনারেল জেভদেত। একসময় মুস্তফা কামাল পাশা জেনারেল জেভদেতের এই গোপন মিশনের কথা জেনে যায় এবং তাকে দলে টেনে নেয়। শুরুতে এশরেফ পাশা এর বিরুদ্ধে থাকলেও একসময় সেও সমর্থন দেয় । আবারো সেই বিশ্বাসঘাতক বন্ধু তেভফিকের গুলিতে এশরেফ পাশার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়। এই পর্যায়ে নাটকে দেখা যায় ইজমিরে গণহত্যা হচ্ছে কিনা তা তদন্ত করতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তি একটি সমন্বিত তদন্ত কমিটি পাঠায়। কিন্তু তদন্ত কমিটির আড়ালে, ইংল্যান্ড নিজেদের সুবিধা আদায় আর সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়াসে এক বৃটিশ গুপ্তচরকে ইজমিরে পাঠায়। সেই গুপ্তচর লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডার তেভফিককে নিজেদের দলে টেনে নেয় এবং গ্রিক জেনারেল ভাসিলিকেও বিভ্রান্ত করতে সফল হয়। কিন্তু জেভদেতের বুদ্ধিমত্তা আর দেশপ্রেমের কাছে ইংল্যান্ড আর গ্রিসের সব ধরনের কূট-কৌশল ব্যর্থ হয়। জেভদেত কৌশলে গ্রিক জেনারেল ভাসিলিকে ফাঁদে ফেলে, সামরিক আদালতের মাধ্যমে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। এরপর সে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একদল প্রভাবশালী গ্রিক সামরিক অফিসারকে হত্যা করে,ইজমিরে গ্রিক শাসনের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়। ইতোমধ্যে গল্পের শেষের দিকে জেভদেতের স্ত্রী বুঝতে পারে, তার স্বামী প্রকৃতপক্ষে একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা। দেশের জন্য লড়াই করছে। আর এভাবেই নাটকটির সমাপ্তি ঘটে।